সালিশ মানি, তালগাছ আমার
এই করোনার মধ্যে একটা দাওয়াত ছিল এক আত্মীয়ের বাসায়। আমাদের পরিবার সহ আরও কয়েকজন কাছের মানুষ এসেছিল সেই দাওয়াতে। ওইখানে আমার এক মামাও এসেছিল, মায়ের চাচাতো ভাই। আড্ডা চলছে যথারীতি। এক পর্যায়ে পৃথিবী গোল নাকি চ্যাপ্টা সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠল। এই একবিংশ শতাব্দিতে বসে প্রথম একজনের মুখে শুনলাম, "আরে ধুরু, এই ইহুদী বিজ্ঞানী সব শয়তানের দল। পৃথিবীকে গোল বলে বসে আছে। আরে পৃথিবী গোল হয়টা কেমন করে? ফাইজলামির একটা সীমা থাকে!" হ্যাঁ, এই কথাটি আমার ওই মামার মুখ থেকে বের হয়।
মামা আসলে বয়সে বেশ বড়। তাই সবাই খুব একটা তর্কে যেতে চায় না উনার সাথে। কিন্তু আমি কিছু না বলে থাকতে পারলাম না।
"আচ্ছা মামা, রুনু আপু তো বেলজিয়ামে থাকে তাই না? আর রাজিব ভাই তো অ্যামেরিকায়?"
"হ্যাঁ, তো?"
"আচ্ছা তাদের কখনো একই সাথে ফোন দিয়ে দেখেছেন? যদি দিয়ে দেখেন তবে দেখবেন, বাংলাদেশ, অ্যামেরিকা ও বেলজিয়াম, এই তিন দেশের সময় তিন রকম। একটু ভেবে দেখেন তো মামা, পৃথিবী গোল না হয়ে চ্যাপ্টা হলে কী এমনটি সম্ভব?..."
শুরু করে দিলাম যুক্তি-তর্ক। মাঝে অবশ্য অনেকেই আমাকে থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আমি আমার তর্ক চালিয়ে যাই। সব যুক্তি-তর্ক দেখালাম। আমার যুক্তি শুনে অনেকটা থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন উনি। কিন্তু শেষে গলা খাকারি দিয়ে বলেন,
"শুনো তুমি ছোট মানুষ, এইসব বুঝবা না। আরে কত এমন প্রশ্ন আছে যার উত্তর ওই শয়তানদয়ের কাছে নাই। যেইগুলাতে বাঁশ খায় ওইগুলা সব আলতুফালতু যুক্তি দিয়ে ভরায় রাখে। দেখ ভাইগ্না, বড় হউ, দেখবা এইগুলা সব ইহুদী-নাসারাদের চক্রান্ত। পৃথিবী আসলেই চ্যাপ্টা। বড় হউ, ঠিকই বুঝবা।"
আমি কী আর বলবো। ততক্ষণে টেবিলে খাবার দিয়ে দিয়েছিল। তাই কথা না বাড়িয়ে পোলাও-কোর্মায় মনোনিবেশ করলাম।
মামা এই জায়গায় যে কুযুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন, সেটির সহজ নাম "তালগাছ আমার কুযুক্তি" বা ইংরেজিতে "Argument From Final Consequences Fallacy"।
উপস্থাপিত যুক্তি-প্রমাণ যা-ই হোক না কেন, যুক্তিতর্কের ফলাফল আপনি আগেই নির্ধারণ করে সেই বিশ্বাসে স্থির থাকলে তাঁকে আমরা বলি Argument From Final Consequences Fallacy। যেমন ধরুন, আপনি বিশ্বাস করেন মঙ্গল গ্রহে মানুষের মত দেখতে এলিয়েন নাসার বিজ্ঞানী পেয়েছে। এখন, এমন কোনো কিছু যে নাসার বিজ্ঞানীরা যে পায়নি, এর পক্ষে সমস্ত তথ্য প্রমাণ ও যুক্তি শোনার পরেও, তার বিপরীতে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ যুক্তি দিতে না পেরেও আপনি বলতে থাকলেন, না না মঙ্গল গ্রহে এমন এলিয়ন পাওয়া গিয়েছে; এমনটি করার কারণ হল, আপনার আস্থা যুক্তি বা প্রমাণে নয়, আপনার আস্থা বিশ্বাসে।
উপরের ঘটনায় আমি যতই যুক্তি-প্রমাণ মামাকে দেই না কেন, মামা মানতেই রাজি না পৃথিবী গোল। উনি পাল্টা কোনো যুক্তি ও প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারেননি, এবং উনার কথার পক্ষেও কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেননি। কেননা, উনার আস্থা যুক্তিতে নয়, উনার আস্থা নিজের বিশ্বাসে।
যতদিন না আমরা যুক্তিতর্ক, তথ্যপ্রমাণের উপর আস্থা রাখবো, ততদিন আমরা এমনই অন্ধের মত থাকবো। বাইরের জগৎ যে কতটা চমৎকার তা দেখতে চাইলে অন্ধ হলে চলবে?




.jpg)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন